বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেসিপি (Bangladeshi Traditional Recipes: The True Essence of Homestyle Flavor) আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঘরোয়া স্বাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ভাত, মাছ, ডাল, ভর্তা থেকে শুরু করে বিরিয়ানি, পোলাও কিংবা ইলিশ মাছের ঝোল—প্রতিটি পদে রয়েছে আলাদা স্বাদ ও পুষ্টিগুণ। এ ধরনের খাবার শুধু পেট ভরায় না, হৃদয়ে ছুঁয়ে যায় দেশের মাটির আসল ঘ্রাণ ও স্বাদ।
বাংলাদেশ এমন এক দেশ যার প্রতিটি অঞ্চলের খাবারের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুস্বাদু মাছ, ভাত, ভর্তা, শাক-সবজি এবং মিষ্টির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবার(bangladeshi traditional food )এগুলো শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টির জন্যও অসাধারণ।
আজকের আর্টিকেলে আমরা জানব – বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের ধরন, জনপ্রিয় রেসিপি, রান্নার পদ্ধতি এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা।
বাংলাদেশি খাবারের ঐতিহ্য
বাংলাদেশে খাবার মানেই আতিথেয়তা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের অনেক রেসিপি রয়েছে, যেমন ভাত, মাছ, ডাল, এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মশলার মিশ্রণে তৈরি তরকারি। এছাড়াও বিরিয়ানি, ইলিশ মাছের তরকারি, পোলাও, খিচুড়ি এবং বিভিন্ন মিষ্টি যেমন রসমালাই খুব জনপ্রিয়। অতিথি এলে ভাত, মাছ, ডাল এবং মিষ্টি পরিবেশন করা হয় ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে। প্রাচীনকাল থেকে নদীমাতৃক বাংলায় মাছ আর ভাতকে বলা হয় “বাংলার প্রধান খাবার”।
বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকা
১. পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজা
উপকরণ:
- ১ কাপ ভাত (রাতে পানিতে ভিজিয়ে রাখা)
- ইলিশ মাছ ২-৩ পিস
- হলুদ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- লবণ স্বাদমতো
- সরিষার তেল ২ টেবিল চামচ
প্রস্তুত প্রণালী: রাতে সেদ্ধ ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে পান্তা ভাত তৈরি হবে। ইলিশ মাছ লবণ ও হলুদ দিয়ে মেখে সরিষার তেলে ভেজে নিন। পান্তা ভাতের সাথে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ এবং ইলিশ ভাজা পরিবেশন করুন।
আরও পড়ুন / Related Recipes:ইলিশ মাছের অনন্য রেসিপি ও পুষ্টিগুণ
২. খিচুড়ি
উপকরণ:
- চাল ১ কাপ
- মুগ ডাল ১/২ কাপ
- পেঁয়াজ কুচি ১টি
- আদা বাটা ১ চা চামচ
- হলুদ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- গরম মসলা ১ চা চামচ
- ঘি ২ টেবিল চামচ
- লবণ স্বাদমতো
রান্নার পদ্ধতি: চাল ও ডাল একসাথে ধুয়ে নিন। কড়াইতে ঘি গরম করে পেঁয়াজ ও আদা ভেজে নিন। চাল-ডাল, হলুদ, লবণ ও পানি দিয়ে নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। পরিবেশনের আগে গরম মসলা ছড়িয়ে দিন।
৩. চিতল মাছের মুইঠ্যা
উপকরণ:
- চিতল মাছের কিমা ৫০০ গ্রাম
- পেঁয়াজ কুচি ১টি
- আদা বাটা ১ চা চামচ
- কাঁচা মরিচ কুচি ২-৩টি
- ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল চামচ
- ছোলার ডাল ভেজানো ২ টেবিল চামচ
- লবণ স্বাদমতো
- সরিষার তেল
প্রস্তুতি: মাছের কিমার সাথে সব উপকরণ মিশিয়ে ছোট ছোট বল তৈরি করুন। কড়াইতে তেল গরম করে মুইঠ্যাগুলো সোনালি করে ভেজে নিন। ঝোল বা ভাজা উভয়ভাবেই পরিবেশন করা যায়।
৪. শুঁটকি ভর্তা
উপকরণ:
- শুঁটকি মাছ ১০০ গ্রাম
- কাঁচা মরিচ ৫-৬টি
- পেঁয়াজ কুচি ১টি
- রসুন ৪-৫ কোয়া
- সরিষার তেল ২ টেবিল চামচ
- লেবুর রস ১ চা চামচ
তৈরির নিয়ম: শুঁটকি ধুয়ে শুকিয়ে ভেজে নিন। মরিচ, পেঁয়াজ, রসুনের সাথে শুঁটকি ভালোভাবে পেষে নিন। সরিষার তেল ও লেবুর রস মিশিয়ে পরিবেশন করুন।
৫. কাঁচকলার কোফতা কারি
উপকরণ:
- কাঁচা কলা ৩টি সেদ্ধ ও মাখানো
- পেঁয়াজ কুচি ১টি
- আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ
- টমেটো কুচি ২টি
- ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ
- জিরা গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- হলুদ ও মরিচ গুঁড়া
- তেল ও লবণ
রান্না: সেদ্ধ কলায় লবণ ও মসলা মিশিয়ে ছোট বল তৈরি করে ভেজে রাখুন। আলাদা কড়াইতে পেঁয়াজ, আদা-রসুন, টমেটো ও মসলা দিয়ে ঝোল তৈরি করুন। কোফতাগুলো ঝোলে দিয়ে ৫-৭ মিনিট সিদ্ধ করুন।
৬. মুরগির রেজালা
উপকরণ:
- মুরগির মাংস ৫০০ গ্রাম
- দই ১/২ কাপ
- পেঁয়াজ বাটা ২টি
- আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ
- এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা
- কাজুবাদাম বাটা ২ টেবিল চামচ
- ঘি ৩ টেবিল চামচ
- দুধ ১/২ কাপ
প্রস্তুতি প্রণালী: মুরগি দই, হলুদ ও লবণ দিয়ে মেরিনেট করুন। ঘি গরম করে গরম মসলা ও পেঁয়াজ বাটা ভুনুন। মুরগি দিয়ে কষান। কাজুবাদাম বাটা ও দুধ দিয়ে নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
আরও পড়ুন / Related Recipes:Healthy Homemade Honey Chicken Recipe: Sweet, and Nutritious Delight
৭. রসমালাই
উপকরণ:
- দুধ ২ লিটার
- চিনি ১ কাপ (রস ও রসমালাইয়ের জন্য)
- লেবুর রস বা ভিনেগার ২ টেবিল চামচ
- এলাচ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- কেশর কয়েক ফোঁটা
- পেস্তা-কাজু কুচি
তৈরির পদ্ধতি: দুধ ফোটার পর লেবুর রস দিয়ে ছানা তৈরি করুন। ছানা থেকে ছোট ছোট চ্যাপ্টা বল তৈরি করে চিনির সিরায় সেদ্ধ করুন। ঘন দুধে চিনি ও এলাচ দিয়ে রস তৈরি করে ছানার বল ভিজিয়ে রাখুন। ঠান্ডা করে কেশর ও বাদাম দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
৮. পিঠা (ভাপা পিঠা)
উপকরণ:
- চালের গুঁড়া ২ কাপ
- নারকেল কোরানো ১ কাপ
- গুড় ১ কাপ
- এলাচ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- লবণ সামান্য
প্রস্তুত প্রণালী: চালের গুঁড়ায় সামান্য পানি ও লবণ মিশিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে দিন। নারকেল ও গুড় একসাথে মিশিয়ে ভর্তা তৈরি করুন। পিঠা তৈরির ছাঁচে আধা চামচ গুঁড়া, তার উপর ভর্তা, আবার গুঁড়া দিয়ে ভাপে ১৫-২০ মিনিট সিদ্ধ করুন।
৯. টেংরা মাছের ঝোল
উপকরণ:
- টেংরা মাছ ৫০০ গ্রাম
- পেঁয়াজ কুচি ১টি
- আদা বাটা ১ চা চামচ
- হলুদ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ
- জিরা গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- টমেটো ১টি
- কাঁচা মরিচ
- সরিষার তেল
রান্নার পদ্ধতি: মাছ হলুদ ও লবণ দিয়ে মেখে হালকা ভেজে রাখুন। তেলে পেঁয়াজ, আদা ভুনুন। টমেটো ও সব মসলা দিয়ে কষান। পানি দিয়ে ফুটে উঠলে মাছ দিয়ে ১০ মিনিট রান্না করুন। কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা ছিটিয়ে নামিয়ে নিন।
১০. শাহী টুকরা
উপকরণ:
- পাউরুটি ৬ স্লাইস
- দুধ ১ লিটার
- ঘি ৪ টেবিল চামচ
- চিনি ৩/৪ কাপ
- এলাচ গুঁড়া ১/২ চা চামচ
- কেশর কয়েক ফোঁটা
- পেস্তা-কাজু কুচি
প্রস্তুতি: পাউরুটি চার ভাগ করে ঘিতে সোনালি করে ভেজে নিন। দুধ ঘন হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দিয়ে চিনি ও এলাচ মিশান। ডিশে পাউরুটি সাজিয়ে গরম দুধ ঢেলে দিন। কেশর ও বাদাম দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।
পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়, শরীরের জন্যও উপকারী।বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারে রয়েছে প্রাকৃতিক উপাদানের ভারসাম্য। ইলিশ মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, খিচুড়িতে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের সমন্বয়, এবং পিঠায় ফাইবার ও খনিজ উপাদান থাকে যা শরীরের জন্য উপকারী।
- মাছ শরীরকে প্রোটিন ও ওমেগা-৩ দেয়।
- ভর্তা ও সবজি ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে।
- ডাল শরীরে প্রোটিন ঘাটতি পূরণ করে।
- ভাত শক্তি যোগায়।
- মিষ্টি পরিমিতভাবে খেলে তাৎক্ষণিক এনার্জি দেয়।
রান্নার টিপস
- তাজা উপকরণ ব্যবহার করুন স্বাদ ও পুষ্টির জন্য
- ঐতিহ্যবাহী মসলার সঠিক অনুপাত বজায় রাখুন
- মাঝারি আঁচে রান্না করলে খাবারের স্বাদ ভালো হয়
- সরিষার তেল বাংলাদেশি খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য
সহজ কিছু রেসিপি
ইলিশ মাছ ভাজা
- ইলিশ কেটে ধুয়ে নিন।
- লবণ ও হলুদ মাখিয়ে গরম তেলে ভেজে নিন।
- গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন।
খিচুড়ি
- চাল ও ডাল ভেজে নিন।
- পেঁয়াজ-আদা-রসুন ভেজে তাতে চাল-ডাল দিয়ে রান্না করুন।
- ইলিশ ভাজা বা ডিম ভাজা দিয়ে পরিবেশন করুন।
আলু ভর্তা
- সেদ্ধ আলু ভালো করে মেখে নিন।
- কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, সরিষার তেল মিশিয়ে ভর্তা তৈরি করুন।
হারিয়ে যাওয়া রেসিপি :(১২০০–১৮৫৮ সাল)
বাঙালি রান্নায় বৈচিত্র্য এবং হারিয়ে যাওয়া রেসিপি গুলো স্থুলভাবে ১২০০–১৮৫৮ সাল, এই প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর বাংলার রান্নার ভূগোল পাল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। উল্লিখিত সময়ে হারিয়ে যাওয়া রেসিপিগুলো:
বেসন দিয়ে চিতল মাছের কোল ভাজা, মাগুর মাছ দিয়ে মরিচের ঝোল, বড় বড় কৈ মাছে কাটার দাগ দিয়ে জিরা-লবঙ্গ মেখে তেলে ভাজা, মহাশোলের অম্বল, ইচা (চিংড়ি) মাছের রসলাস, রোহিত (রুই) মাছের মাথা দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল, আম দিয়ে কাতলা মাছ, পাবদা মাছ ও আদা দিয়ে শুকতুনি, আমচুর দিয়ে শোল মাছের পোনা, তেঁতুল–মরিচসহ বোয়াল মাছের ঝাঁটি, ইলিশ মাছ ভাজা, বাচা, ইচা, শোল, শোলপোনা, ভাঙ্গনা, রিঠা ও পুঠা (পুঁটি) মাছ ভাজা। খাসি, হরিণ, মেষ, কবুতর, কাউঠা (ছোট কচ্ছপ) প্রভৃতির মাংস। এগুলো এখন আর পরিবেশিত হয় না |
নতুন ধরনের খাবার /ভবিষ্যতের নতুন পাঁচ খাবার
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী(১৯৪৭ – ১৫ জানুয়ারি ২০২৫) একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং লেখক ছিলেন। বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞান/পরিবেশবিজ্ঞান শাখায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০২১ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন|পুষ্টি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি অসংখ্য গ্রন্থ, গবেষণা ও প্রবন্ধ রচনা করেন।অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর মতে,আগামী দিনে পাঁচ রকম নতুন খাবার(innovative food)আসছে।
১.ল্যাব ল্যাব বিন
এর অপর নাম হায়াসিন বিন। লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম আর প্রোটিনের উৎস। শুকনা, খারাপ ও দূষিত জমিতেও জন্মায় এটি।
২.এনসেট
মেকি কলা। কলার সমগোত্রীয় এই ফল এরই মধ্যে ইথিওপিয়ার দুই কোটি লোকের আহার্য হয়ে আছে। খরা, বন্যা আর উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এটি। এর কাণ্ড আর মূল দিয়ে তৈরি করা যায় পরিজ আর রুটি।
৩.মাশুয়া
এটি আলুর মতো। এর উৎস আন্দিজ পর্বতমালা। এর মূলের স্বাদ শর্ষের মতো। জন্মাতে সময় লাগে কম আর গজানো সহজ।
৪.কুকামেলনস
এটা মুচমুচে কুড়মুড়ে ছোট সবজি। এর স্বাদ হলো শসা আর লেবুর মিশেল। খরা আর পোকা–পতঙ্গ এদের কিছু করতে পারে না|
৫.পানডানুস
আনারসি এই ফল কাঁচা খাওয়া যায় আবার রান্না করেও খাওয়া যায়। এই বৃক্ষ সহ্য করতে পারে খরা, ঝোড়ো বাতাস আর নোনা জল।
উপসংহার
বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেসিপি শুধু আমাদের সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না, বরং প্রতিদিনের জীবনে পুষ্টি ও আনন্দ যোগায়। এই খাবারগুলো ঘরে রান্না করা সহজ এবং পরিবারের সবাইকে একসাথে নিয়ে আসে।
তাই ঘরে বসেই চেষ্টা করুন কিছু ঐতিহ্যবাহী রেসিপি। এটি আপনাকে শুধু সুস্বাদু খাবারই দেবে না, বরং আপনার রান্নাঘরে এনে দেবে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া।
ঘরোয়া স্বাদের আসল অনুভূতি পেতে ভিজিট করুন: Runnar Hut

Leave a Reply Cancel reply