রমজান পবিত্র মাস। এই মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর অনেকেই ইফতারে বেশি খান। ফলে ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। তবে সঠিক নিয়ম মেনে চললে রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এমনকি এই সময়টাকে ওজন কমানোর সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো যায়।রমজান মাসে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
ইফতার ও সেহরিতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাবার এড়িয়ে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন। পর্যাপ্ত পানি পান এবং পরিমিত খাবার গ্রহণ শরীরকে সুস্থ রাখে।নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে অতিরিক্ত ওজন বাড়ার ঝুঁকি কমে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে রমজানে ওজন কমে। তাই আজ জানব রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর উপায়গুলো। এছাড়া থাকছে খাদ্য তালিকা। সুতরাং শুরু করা যাক।
কেন রমজানে ওজন বেড়ে যায়?
অনেকে মনে করেন রোজা রাখলে ওজন কমবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উল্টো ফল। তাই কারণগুলো জানা জরুরি।
- ইফতারে ভাজাপোড়া বেশি খাওয়া হয়। এগুলোতে ক্যালোরি অনেক বেশি থাকে সুতরাং এসব খাবার ওজন বাড়ায়।
- সারাদিন না খাওয়ার পর শরীর সংরক্ষণ মোডে যায়। ফলে মেটাবলিজম বা বিপাক ধীর হয়ে যায়। অতএব চর্বি জমতে শুরু করে।
- অনেকে রোজায় সারাদিন বিশ্রাম নেন। এতে ক্যালোরি খরচ কমে যায়। তাছাড়া রাতে ভারী খাবার খেয়ে ঘুমানোও ক্ষতিকর। এছাড়া সেহরি এড়িয়ে যাওয়াও বড় ভুল।
রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়
আসুন এখন জেনে নিই রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ এর উপায়। নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন। তাহলে আপনি সুস্থ থাকবেন এবং ওজনও কমবে।
১. ইফতারে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন
ইফতার শুরু করুন ২-৩টি খেজুর দিয়ে। বিশেষ করে আজওয়া খেজুরের উপকারিতা অনেক বেশি। এরপর এক গ্লাস পানি পান করুন। এটি সুন্নত এবং স্বাস্থ্যকরও বটে। তাই খেজুর দ্রুত শক্তি দেয়। এছাড়া রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এরপর হালকা স্যুপ খেতে পারেন। অথবা লেবুর শরবত খান। তবে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলুন। বরং গ্রিল করা মুরগি বা মাছ বেছে নিন। এতে ক্যালোরি কম এবং প্রোটিন বেশি।
মনে রাখবেন, ইফতারে বেশি খাওয়া যাবে না। বরং অল্প অল্প করে খান। এছাড়া ধীরে ধীরে খান এতে হজম ভালো হয় এবং বেশি খাওয়া থেকে বাঁচা যায়।
২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
পানি শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ এর জন্য পানি অপরিহার্য। তাই ইফতার থেকে সেহরির মধ্যে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
পানি বিপাক প্রক্রিয়া দ্রুত করে। এছাড়া ক্ষুধাও নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে পানিশূন্যতা হলে শরীর ক্লান্ত হয়। ফলে মিষ্টি খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে। সুতরাং নিয়মিত পানি পান করুন।
ক্যাফেইনযুক্ত চা ও কফি কম পান করুন। কারণ এগুলো মূত্রবর্ধক এবং পানি বের করে দেয়। বরং ডাবের পানি পান করুন। অথবা লেবু পানি বা তরমুজের জুস খান।
৩. নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন
অনেকে মনে করেন রোজায় ব্যায়াম করা যায় না। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং ইফতারের ৩০ মিনিট পর হালকা ব্যায়াম করা যায়। ফলে হজম ভালো হয় এবং ক্যালোরি খরচ হয়।
দ্রুত হাঁটা খুবই ভালো ব্যায়াম। এছাড়া হালকা জগিং করতে পারেন। অথবা সাইকেল চালান। তাছাড়া বাসায় যোগব্যায়াম করুন। আবার স্কোয়াট বা পুশআপও করতে পারেন। তাই সপ্তাহে ৪-৫ দিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।
তারাবি নামাজও একটি চমৎকার শারীরিক কার্যকলাপ। এতে ক্যালোরি বার্ন হয়। এছাড়া শরীর সচল থাকে। সুতরাং তারাবি নিয়মিত পড়ুন।
৪. সেহরি কখনো এড়িয়ে যাবেন না
অনেকে মনে করেন সেহরি না খেলে ওজন কমবে। কিন্তু এটি একদম ভুল ধারণা। বরং সেহরি না খেলে মেটাবলিজম ধীর হয়। ফলে চর্বি জমতে থাকে।
সেহরিতে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খান। যেমন ডিম খান। এছাড়া দুধ বা দই খেতে পারেন। অথবা মাছ বা মুরগি খান। তাছাড়া জটিল কার্বোহাইড্রেটও রাখুন। যেমন লাল চালের ভাত বা ওটস। আবার গমের রুটিও খেতে পারেন।
ফল ও সবজি অবশ্যই রাখুন। কারণ এগুলোতে ফাইবার থাকে। ফলে দীর্ঘসময় পেট ভরা থাকে। সুতরাং সেহরি খাওয়ার অভ্যাস করুন।
৫. প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য বেছে নিন
প্রোটিন অত্যন্ত জরুরি। এটি পেশী তৈরি করে এবং দীর্ঘ সময় তৃপ্তি দেয়। তাই সেহরির খাবারে প্রোটিন রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মাছ ও মুরগিতে প্রচুর প্রোটিন রয়েছে। তাছাড়া ডাল ও ডিমেও প্রোটিন পাওয়া যায়। এছাড়া দুগ্ধজাত খাবারেও ভালো প্রোটিন থাকে। আবার বাদাম ও চিয়া সিডও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস। সুতরাং এগুলো নিয়মিত খাওয়ার চেষ্টা করুন।
ফাইবার হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাই রমজানে প্রতিদিন শাকসবজি খাওয়া উচিত। পাশাপাশি ফলমূল নিয়মিত খেতে পারেন অথবা গোটা শস্য ও ডাল খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। তাই সেহরির খাবারে সবজি ও ফল রাখা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ খাবারের আইডিয়া জানতে পড়তে পারেন 👉 সহজ ও স্বাস্থ্যকর ভেগান মিক্সড ভেজিটেবল রেসিপি।
৬. আত্মনিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করুন
রমজানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ। ইফতারে সামনে অনেক খাবার থাকে। তবে নিজেকে সংযত রাখতে হবে। কারণ রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপার।
পিজ্জা, বার্গার দেখলে খেতে ইচ্ছা করে। তাছাড়া সমুচা, জিলাপিও লোভনীয়। কিন্তু এগুলো উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত। এছাড়া পুষ্টিগুণও কম। তাই যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
সপ্তাহে একদিন পছন্দের খাবার খান। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এছাড়া ছোট প্লেট ব্যবহার করুন। ফলে কম খাওয়া হয়।
৭. ঘুম পর্যাপ্ত নিন
পর্যাপ্ত ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি। তাই প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান। কারণ কম ঘুমালে ক্ষুধা বাড়ে। ফলে মিষ্টি খাবার খাওয়ার ইচ্ছা হয়।
তারাবি নামাজের পর হালকা ঘুম দিন। এতে শরীর বিশ্রাম পায়। এছাড়া তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে সুবিধা হয়। তাছাড়া দিনেও কিছুক্ষণ ঘুমান।
রাতে খুব দেরিতে ঘুমাবেন না। বরং নিয়মিত রুটিন মেনে চলুন। ফলে ঘুম ভালো হয় এবং শরীরও সুস্থ থাকে।
৮. ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করুন
প্রতিদিন কত ক্যালোরি খাচ্ছেন তা জানুন। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক ১২০০-২০০০ ক্যালোরি দরকার। তবে বয়স ও লিঙ্গের উপর নির্ভর করে এটি ভিন্ন হতে পারে।
ইফতার, রাতের খাবার ও সেহরি মিলিয়ে হিসাব করুন। এছাড়া চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। বরং পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন। ফলে ক্যালোরি কম থাকবে।
খাবারের লেবেল পড়ার অভ্যাস করুন। তাহলে ক্যালোরি, চিনি ও চর্বি জানতে পারবেন। এছাড়া সচেতনভাবে খাবার বেছে নিতে পারবেন।
৯. চিনি ও লবণ কমিয়ে দিন
অতিরিক্ত চিনি ওজন বাড়ানোর প্রধান কারণ। মিষ্টি, জুসে প্রচুর চিনি থাকে। তাছাড়া কোমল পানীয়তেও আছে। এছাড়া মিষ্টি চা-কফিতেও চিনি বেশি। তাই এগুলো এড়িয়ে চলুন।
প্রাকৃতিক মিষ্টি খেতে পারেন। যেমন খেজুর খান। এছাড়া মধু বা ফলও খেতে পারেন। কারণ এগুলো স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। সুতরাং প্রাকৃতিক মিষ্টি বেছে নিন।
অতিরিক্ত লবণও ক্ষতিকর। এটি শরীরে পানি ধরে রাখে। ফলে ওজন বাড়ে। তাই ইফতার ও সেহরিতে কম লবণযুক্ত খাবার খান।
১০. মানসিক চাপ কমান
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ওজন বাড়ায়। এটি কর্টিসল হরমোন বাড়ায়। ফলে চর্বি জমে। তাই রমজানে মানসিক শান্তি বজায় রাখুন।
কোরআন তেলাওয়াত মানসিক শান্তি দেয়। এছাড়া ধ্যান ও প্রার্থনা করুন। তাছাড়া পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান। তাই হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। এছাড়া নিজের যত্ন নিন। কারণ মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে শারীরিকভাবেও সুস্থ থাকা যায়।
রমজানে যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন
কিছু খাবার রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ এ বাধা সৃষ্টি করে। তাই এগুলো এড়িয়ে চলুন।
প্রথমত, ভাজা খাবার এড়ান। যেমন সমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি। কারণ এগুলোতে প্রচুর তেল ও ক্যালোরি থাকে। বরং সেদ্ধ বা গ্রিল করা খাবার বেছে নিন।
দ্বিতীয়ত, মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়ান। যেমন জিলাপি, রসগোল্লা, চমচম। কারণ এগুলোতে চিনি অনেক বেশি। বরং ফলের সালাদ বা খেজুর খান।
তৃতীয়ত, প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ান। বার্গার, পিজ্জা, নুডলস এগুলো অস্বাস্থ্যকর। ফলে ওজন বাড়ায়। বরং ঘরে তৈরি খাবার খান।
কোমল পানীয় একদম এড়িয়ে চলুন। কারণ এতে প্রচুর চিনি ও ক্যালোরি আছে। বরং পানি, ডাবের পানি বা লেবু পানি পান করুন।
রমজানে ওজন কমানোর খাদ্য তালিকা
এখন আসুন জেনে নিই একটি নমুনা খাদ্য তালিকা। এটি রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ এ সাহায্য করবে।
ইফতার (সন্ধ্যা ৬টা):
- ২-৩টি খেজুর
- ১ গ্লাস পানি
- ছোলার সালাদ বা ফলের সালাদ
- গ্রিলড চিকেন বা মাছ (১ পিস)
- সবজির স্যুপ
তারাবি নামাজের পর (রাত ৯টা):
- ১ কাপ গ্রিন টি
- হালকা বাদাম (৫-৭টি)
রাতের খাবার (রাত ১০টা):
- লাল চালের ভাত বা গমের রুটি (১ বাটি)
- মাছ বা মুরগি (ছোট ১ পিস)
- সবজি ভর্তা বা তরকারি
- সালাদ
- দই (১ বাটি)
তাহাজ্জুদের পর (রাত ৩টা):
- ১ গ্লাস পানি
- ১টি ফল (আপেল/কলা)
সেহরি (ভোর ৪টা):
- ওটস বা লাল আটার রুটি
- ২টি সেদ্ধ ডিম বা অমলেট
- সবজি সালাদ
- ১ গ্লাস দুধ বা দই
- ১টি ফল
- ২ গ্লাস পানি
এই খাদ্য তালিকা মেনে চলুন। তাহলে পুষ্টি পাবেন। এছাড়া ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সারসংক্ষেপ
পরিশেষে বলা যায়, রমজানে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ মেনে চলুন। তাহলে এটি সম্ভব। তাই ইফতার ও সেহরিতে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
ভাজা খাবার ও মিষ্টি এড়িয়ে চলুন। এছাড়া প্রচুর পানি পান করুন এবং হালকা ব্যায়াম করুন। তাছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম নিন এবং মানসিক চাপ কমান। ফলে আপনি সুস্থ থাকবেন এবং ওজনও কমবে।
রমজান শুধু ইবাদতের মাস নয়। বরং এটি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার মাসও। তাই এই সুযোগে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। সুতরাং সুস্থ শরীর নিয়ে ইবাদতেও মনোযোগ দিতে পারবেন বেশি।
আশা করি এই টিপসগুলো মেনে চললে আপনি সুস্থ থাকবেন। এছাড়া আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সবাইকে রমজান মুবারক!

Leave a Reply Cancel reply