ভূমিকা: পুরান ঢাকার বিরিয়ানি কেন এত বিশেষ
পুরান ঢাকার Biryani শুধু একটি জনপ্রিয় খাবার নয়। বরং এটি ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
এই বিরিয়ানির প্রতিটি দানায় লুকিয়ে আছে চারশ বছরের ঐতিহ্য।
আজও পুরান ঢাকার সরু গলিতে হাঁটলে প্রথমেই নাকে আসে বিরিয়ানির ঘ্রাণ।এই ঘ্রাণ মানুষকে টেনে আনে ইতিহাসের গভীরে।
তাই চলুন, আমরা ধাপে ধাপে জানি পুরান ঢাকার বিরিয়ানির জন্ম, বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব।
মোগল আমল ও পুরান ঢাকার বিরিয়ানির সূচনা
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মোগল শাসনামলে।
বিশেষ করে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে।
১৬০৮ থেকে ১৭১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ছিল বাংলা সুবাহের রাজধানী।এই সময়ে ঢাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বেড়ে যায়।
ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করে।একই সঙ্গে আসে ভিন্ন ভিন্ন খাদ্য সংস্কৃতি।
ইসলাম খান চিশতি ও খাদ্য সংস্কৃতির বিকাশ
১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকার দায়িত্ব নেন।তার শাসনামলে ঢাকায় মোগল দরবারি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
মোগল শাসকেরা ভালো খাবার পছন্দ করতেন।বিশেষ করে তারা সুগন্ধি চাল ও মসলাযুক্ত খাবারে আগ্রহী ছিলেন।
এই সূত্রেই ফারসি, তুর্কি ও আরবি রন্ধনশৈলী বাংলায় প্রবেশ করে।পরবর্তীতে এই ধারার সঙ্গে মিশে যায় স্থানীয় বাঙালি স্বাদ।
এভাবেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় পুরান ঢাকার বিরিয়ানি।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদে মিশে থাকা সংস্কৃতি
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি শুধু রান্নার ফল নয়।বরং এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন।
একদিকে মোগল দরবারের জাঁকজমক।অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের সহজ জীবনধারা।
এই দুই ধারার মিলন থেকেই তৈরি হয় অনন্য স্বাদের বিরিয়ানি।যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
হাজির বিরিয়ানি: পুরান ঢাকার বিরিয়ানির প্রাণকেন্দ্র
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি বললেই প্রথমে আসে হাজির বিরিয়ানির নাম।এটি ঢাকার সবচেয়ে পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি প্রতিষ্ঠান।
হাজির বিরিয়ানির যাত্রা শুরু
১৯৩৯ সালে হাজি মোহাম্মদ হোসেন মাত্র এক হাঁড়ি বিরিয়ানি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।প্রথম দিনেই তিনি অসাধারণ স্বাদের কারণে পরিচিতি পান।
ধীরে ধীরে তার বিরিয়ানি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে হাজির বিরিয়ানির সুনাম।
পরবর্তীতে তার ছেলে হাজি গোলাম হোসেন দায়িত্ব নেন।বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্ম হাজি মোহাম্মদ সাহেদ হুসাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
হাজির বিরিয়ানির বিশেষত্ব
হাজির বিরিয়ানি অন্যদের থেকে আলাদা।কারণ তারা গরুর মাংস ব্যবহার করেন না।
তারা শুধুমাত্র খাসির মাংস ব্যবহার করেন।এতে স্বাদ আরও গভীর হয়।
এছাড়া তারা ঘি বা বাটারের বদলে সরিষার তেল ব্যবহার করেন।এই তেল বিরিয়ানিকে আলাদা সুগন্ধ দেয়।
আজও তারা মাটির হাঁড়িতে রান্না করেন।এমনকি কাঁঠাল পাতার প্লেটেও পরিবেশন করেন।
২০২৫ সালে হাজির বিরিয়ানি গুলিস্তানে নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে।তবুও মূল শাখার ঐতিহ্য অটুট রয়েছে।
হানিফ বিরিয়ানি: প্রতিযোগিতার মাঝেও স্বাতন্ত্র্য
হানিফ বিরিয়ানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালে।প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হাজি মোহাম্মদ হানিফ।
মজার বিষয় হলো, এই দোকানটি হাজির বিরিয়ানির ঠিক সামনে অবস্থিত।ফলে শুরু থেকেই প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র।
তবে হানিফ বিরিয়ানি মান ও স্বাদে আপস করেনি।বরং তারা নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে।
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর তার ছেলে ব্যবসার দায়িত্ব নেন।বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাদের শাখা রয়েছে।
হানিফ বিরিয়ানির আকর্ষণ
হানিফ বিরিয়ানির প্রধান আকর্ষণ খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি। মাংস নরম ও মসলার ভারসাম্য নিখুঁত।
এ কারণেই ভোজনরসিকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
হাজি নান্না বিরিয়ানি: স্বাদের ধারাবাহিকতা
১৯৬২ সালে হাজি নান্না মিয়া বাবুর্চি হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন।প্রথমে তিনি মোরগ পোলাও বিক্রি করতেন।
পরবর্তীতে কাচ্চি বিরিয়ানি যুক্ত করেন।এই সিদ্ধান্ত তার ব্যবসাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
প্রতি মাসের পাঁচ তারিখে আস্ত মোরগের বিরিয়ানি বিক্রি হয়।এই দিনটি এখনো বিশেষ আকর্ষণ।
কাচ্চি বিরিয়ানির উত্থান
১৯৯০ সালের দিকে পুরান ঢাকার হাজি মোহাম্মদ হাশেম আলী কাচ্চি বিরিয়ানি জনপ্রিয় করেন।তিনি এটি বাণিজ্যিকভাবে পরিবেশন শুরু করেন।
তার রেসিপি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।আজও তার উত্তরসূরিরা সেই ঐতিহ্য বহন করছেন।বর্তমানে কাচ্চি বিরিয়ানি ঢাকার অন্যতম পরিচিত খাবার।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির উপকরণ ও স্বাদের রহস্য
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদ নির্ভর করে উপকরণের উপর। প্রতিটি উপাদান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রধান উপকরণ
- সুগন্ধি বাসমতি বা পোলাও চাল
- খাসির মাংস
- টক দই
- এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ
- জায়ফল ও জিরা
- সরিষার তেল
- জাফরান ও গোলাপজল
এই উপকরণগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করে অনন্য স্বাদ।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির স্বাস্থ্য উপকারিতা
যদিও বিরিয়ানি সমৃদ্ধ খাবার, তবুও পরিমিত খেলে উপকার পাওয়া যায়।
প্রথমত, এটি প্রোটিনের ভালো উৎস। খাসির মাংস শরীরের শক্তি বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, মসলায় থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া চাল থেকে তাৎক্ষণিক শক্তি পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, বিরিয়ানির ঘ্রাণ ও স্বাদ মানসিক প্রশান্তি দেয়।
উপকরণের বিশেষত্ব
পুরান ঢাকার বিরিয়ানিতে বিশেষ কিছু উপকরণ ব্যবহার করা হয় যা এর স্বাদকে অনন্য করে তোলে:
- সুগন্ধি চাল: বাসমতি বা পোলাও চাল ব্যবহার করা হয় যা বিরিয়ানির টেক্সচার ও সুগন্ধ বাড়ায়|
- খাসির মাংস: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাসির মাংস ব্যবহার করা হয় কারণ এটি দ্রুত সিদ্ধ হয় ও স্বাদে অতুলনীয়|
- টক দই: মাংসকে নরম ও রসালো করতে টক দই ব্যবহার করা হয়|
- বিশেষ মসলা: এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জিরা এবং গরম মসলার বিশেষ মিশ্রণ|
- সরিষার তেল: অনেক ঐতিহাসিক দোকান ঘি বা বাটারের বদলে দেশীয় সরিষার তেল ব্যবহার করে|
- জাফরান ও গোলাপজল: রঙ ও সুগন্ধের জন্য এগুলো অপরিহার্য|
স্বাস্থ্য উপকারিতা
যদিও বিরিয়ানি একটি সমৃদ্ধ খাবার, সঠিক পরিমাণে খেলে এর রয়েছে বেশ কিছু উপকারিতা —
- protein এর উৎস: গরু বা খাসির মাংস শরীরের কোষ মেরামত ও শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান: এলাচ, দারচিনি ও জাফরান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- এনার্জি বুস্টার: চাল ও ঘি শরীরকে তাত্ক্ষণিক শক্তি দেয়।
- মানসিক তৃপ্তি: ঘ্রাণ ও স্বাদ মনকে প্রফুল্ল করে, যা মানসিক প্রশান্তিতে সাহায্য করে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
পুরান ঢাকার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন বিরিয়ানির দোকান হল হাজির বিরিয়ানি। ১৯৩৯ সালে হাজি মোহাম্মদ হোসেন মাত্র এক হাঁড়ি বিরিয়ানি নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেন। খাবারের গুণমান ও অসাধারণ স্বাদের জন্য দ্রুতই হাজির বিরিয়ানির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে তার ছেলে হাজি গোলাম হোসেন এবং বর্তমানে নাতি হাজি মোহাম্মদ সাহেদ হুসাইন বংশপরম্পরায় এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। প্রায় তিন প্রজন্ম ধরে একই রেসিপি ও মান বজায় রেখে হাজির বিরিয়ানি আজও ঢাকাবাসীর হৃদয়ে রাজত্ব করছে।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিয়েবাড়ি, খৎনা অনুষ্ঠান, ঈদ, জন্মদিন কিংবা যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে পুরান ঢাকায় বিরিয়ানি অপরিহার্য। বিশেষ করে Ramadan মাসে ইফতারের সময় পুরান ঢাকার বিরিয়ানি দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
কাজী আলাউদ্দিন রোড, নাজিমুদ্দিন রোড, উর্দু রোড, বংশাল, সিদ্দিকবাজার, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, ওয়ারী, মালিটোলা এবং মৌলভীবাজার এলাকায় বিরিয়ানির দোকানগুলোতে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও পর্যটকরা আসেন পুরান ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদ নিতে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
তবে এই ঐতিহ্য রক্ষার পথও সহজ নয়। আধুনিকায়ন, জায়গা সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং পুরান ঢাকার অবকাঠামোগত সমস্যা এই ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মানুষের ভালোবাসা ও ভোজনরসিকতাই এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার প্রধান চালিকা শক্তি।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পুরান ঢাকার এই খাদ্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রয়োজন। এই ঐতিহাসিক দোকানগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের জন্য সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি।
উপসংহার: শুধু খাবার নয়, এক জীবন্ত ইতিহাস
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার নয়, এটি চারশ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ। মোগল সাম্রাজ্যের হাত ধরে আসা এই খাবার কালক্রমে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
হাজির বিরিয়ানি, হানিফ বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান দশকের পর দশক ধরে রক্ষা করে চলেছেন এই ঐতিহ্য। মাটির হাঁড়ি, কাঠের চুলা, খাসির মাংস, বিশেষ বিরিয়ানি মসলা (species)এর মিশ্রণ – এসব মিলে তৈরি হয় এক অসাধারণ স্বাদের অভিজ্ঞতা যা একবার চাখলে জীবনভর মনে থেকে যায়।
পুরান ঢাকার সংকীর্ণ অলিগলি আর সেই গলিতে ভেসে আসা বিরিয়ানির ঘ্রাণ – এই দৃশ্য বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতির এক অনন্য চিত্র। এই ঐতিহ্য আমাদের সবার দায়িত্ব সযত্নে রক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও উপভোগ করতে পারে পুরান ঢাকার বিরিয়ানির অতুলনীয় স্বাদ ও ঐতিহ্য।
আরও রেসিপির জন্য চোখ রাখুন: Runnar Hut

[…] বাংলার খাদ্য সংস্কৃতি শুধুমাত্র স্বাদের নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য সমন্বয়। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু এবং বিভিন্ন সভ্যতার প্রভাবে বাংলার রান্নাঘর হয়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ খাদ্য ভান্ডার। আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানবো বাংলার জনপ্রিয় খাবারের ইতিহাস। […]