বিফ স্টেক বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও অভিজাত খাবারের একটি। পশ্চিমা খাবারের তালিকায় এর অবস্থান শীর্ষে থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশেই বিফ স্টেক ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসবে সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রেস্তোরাঁ, হোটেল এমনকি ঘরোয়া রান্নাতেও এখন স্টেক দেখা যায়।
সঠিক কাট, সঠিক রান্না পদ্ধতি এবং উপযুক্ত মশলা ব্যবহার করলে বিফ স্টেক হয়ে ওঠে নরম, রসালো ও অতুলনীয় স্বাদের। এই লেখায় আমরা বিফ স্টেকের ইতিহাস, ধরন, পুষ্টিগুণ, রান্নার কৌশল, পরিবেশন পদ্ধতি এবং স্বাস্থ্য দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
বিফ স্টেক কী?
বিফ স্টেক এর জন্য সাধারণত গরুর মাংসের পাঁজর বা কোমরের নরম অংশ থেকে নেওয়া কাটা মোটা স্লাইস। সাধারণত এই মাংস গ্রিল, প্যান-ফ্রাই বা ওভেনে রান্না করা হয়।
স্টেকের মূল আকর্ষণ হলো এর প্রাকৃতিক স্বাদ, যা অতিরিক্ত মশলা ছাড়াই ফুটে ওঠে। সঠিকভাবে রান্না করা হলে বিফ স্টেক বাইরে হালকা বাদামি এবং ভেতরে রসালো ও নরম থাকে।
বিফ স্টেকের ইতিহাস
বিফ স্টেকের ইতিহাস বহু পুরনো এবং এটি ইউরোপীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে গরুর মাংস খোলা আগুনে ঝলসে খাওয়ার প্রচলন ছিল। ইংল্যান্ডে প্রথম “স্টেক” শব্দটি জনপ্রিয়তা পায়, যেখানে বড় আকারের মাংসের টুকরো আগুনে রান্না করে পরিবেশন করা হতো।
পরবর্তীতে ফ্রান্সে স্টেক রান্নার কৌশলে পরিশীলিততা আসে এবং বিভিন্ন সসের ব্যবহার শুরু হয়। আমেরিকায় গিয়ে বিফ স্টেক একটি আলাদা পরিচিতি পায়, যেখানে গরুর মাংসের বিভিন্ন কাট আলাদা নামে পরিচিত হয় এবং গ্রিলিং সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
আজকের দিনে বিফ স্টেক শুধু একটি খাবার নয়, বরং এটি আধুনিক পশ্চিমা খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিফ স্টেকের জনপ্রিয় কাটসমূহ
বিফ স্টেকের স্বাদ ও নরমত্ব অনেকাংশেই নির্ভর করে কোন অংশের মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। নিচে সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় বিফ স্টেক কাটগুলো আলাদা করে তুলে ধরা হলো:
১. রিবআই স্টেক
রিব অংশ থেকে কাটা এই স্টেকটিতে প্রাকৃতিক ফ্যাট বেশি থাকে।গরুর পাঁজরের অংশ থেকে কাটা একটি বিশেষ মাংসের টুকরো, যা এর ভেতরের চর্বির (marbling) কারণে অত্যন্ত রসালো, নরম এবং সুস্বাদু হয়, এটি গ্রিল, প্যান-সিয়ার বা বারবিকিউ করে খাওয়া যায় এবং সাধারণত সবজি ও আলু দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এই স্টেকের বিশেষত্ব হলো এর প্রচুর চর্বির স্তর যা রান্নার সময় গলে গিয়ে মাংসকে আরও সুগন্ধি ও স্বাদযুক্ত করে তোলে।
২. সিরলয়েন স্টেক
গরুর পেছনের দিকের অংশ থেকে নেওয়া হয়। এটি গরুর কোমরের পেছনের অংশ (Sirloin) থেকে কাটা একটি জনপ্রিয়, সাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে চর্বিহীন অথচ সুস্বাদু স্টেক [৭, ১১]। এটি গ্রিল বা প্যানে ভাজার জন্য উপযোগী এবং প্রতি ৩ আউন্স পরিবেশনে প্রায় ২৬ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করে
৩. টেন্ডারলয়েন (ফিলে মিনিওন)
টেন্ডারলয়েন হলো গবাদি পশু বা অন্যান্য প্রাণীর মেরুদণ্ডের পাশের পেশী, যা সবচেয়ে কোমল ও নরম মাংস হিসেবে পরিচিত। এটি সাধারণত হাড়বিহীন এবং চর্বিহীন হয়, যা স্টেক, রোস্ট বা দ্রুত রান্না (stir-fry) করার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি “আন্ডার-কাট” বা ফিলিট (fillet) নামেও পরিচিত।
ফ্যাট কম থাকায় এটি স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছে জনপ্রিয়। এটি প্রিমিয়াম মানের মাংস, যা উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ|
৪. টি-বোন স্টেক
ইংরেজি বর্ণ ‘T’ এর মতো এটি দেখতে কটি হাড়ের সাথে যুক্ত থাকে |এই স্টেকে একসঙ্গে টেন্ডারলয়েন ও স্ট্রিপ স্টেকের স্বাদ পাওয়া যায়। মাঝখানে টি-আকৃতির হাড় থাকায় রান্নার সময় স্বাদ আরও গভীর হয়।
৫. স্ট্রিপ স্টেক
গরুর পিঠের দিকের (loin) নরম মাংসের একটি জনপ্রিয় অংশ, যা এর গাঢ় স্বাদ, সুষম চর্বি (marbling) এবং নরম টেক্সচারের জন্য পরিচিত। এটি স্বাদ ও টেক্সচারের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখে। গ্রিল ও প্যান-ফ্রাই—দুই পদ্ধতির জন্যই এটি উপযোগী।ভালো মানের স্ট্রিপ স্টেকের জন্য মাংসের গায়ে চর্বির রেখা (marbling) দেখে কেনা উচিত|
বিফ স্টেকের পুষ্টিগুণ
বিফ স্টেক শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
- উচ্চমাত্রার প্রোটিন: শরীরের পেশি গঠন ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক
- আয়রন: রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে কার্যকর
- ভিটামিন বি১২: স্নায়ু ও মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
- জিঙ্ক: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
- স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: শক্তি জোগাতে সহায়তা করে
পরিমিত পরিমাণে খেলে বিফ স্টেক একটি পরিপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাবার।
বিফ স্টেক রান্নার প্রস্তুতি
প্রথমে মাংসের টুকরা ধুয়ে কিচেন টাওয়েল দিয়ে চেপে চেপে ভালো করে মুছে নিন।
মাংস নির্বাচন
ভাল স্টেকের জন্য সঠিক মাংস নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাজা, উজ্জ্বল লাল রঙের এবং মাঝারি ফ্যাটযুক্ত মাংস বেছে নেওয়া উচিত।
কাটা ও ধোওয়া
মাংসের তন্তুর বিপরীতে চ্যাপ্টা করে কাটা হয়। ধুয়ে কিচেন টাওয়েল দিয়ে ভালোভাবে মুছে নিতে হবে যাতে পানি না থাকে।
মেরিনেশন
লবণ, গোলমরিচ, আদা বাটা, পেঁপে বাটা (মাংস নরম করতে), পাপরিকা, লেবুর রস ইত্যাদি দিয়ে মেখে ৩-৪ ঘণ্টা ফ্রিজে রাখা ভালো|
অনেকে স্টেক মেরিনেট করে না ,না করলেও হালকা লবণ, গোলমরিচ ও অলিভ অয়েল ব্যবহার করলে স্বাদ আরও ভালো হয়।
রুম টেম্পারেচার
রান্নার আগে মাংস ফ্রিজ থেকে বের করে ২০–৩০ মিনিট রেখে দিলে সমানভাবে রান্না হয়।
বিফ স্টেক রান্নার পদ্ধতি
বিফ স্টেক রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিটি পদ্ধতিই আলাদা স্বাদ ও টেক্সচার তৈরি করে। সঠিক পদ্ধতি বেছে নিলে স্টেক আরও উপভোগ্য হয়।
প্যান-ফ্রাই পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে গরম প্যানে অল্প তেল বা বাটার ব্যবহার করে স্টেক দুই পাশে সমানভাবে ভাজা হয়। ঘরোয়া রান্নার জন্য এটি সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় উপায়।
গ্রিল পদ্ধতি
গ্রিলে রান্না করলে স্টেকে ধোঁয়াটে ও স্মোকি ফ্লেভার আসে। খোলা আগুন বা গ্রিল প্যানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ওভেন পদ্ধতি
প্রথমে প্যানে স্টেকের বাইরের অংশ সিল করে নিয়ে পরে ওভেনে নির্দিষ্ট তাপে রান্না করা হয়। এতে ভেতরের অংশ নরম ও রসালো থাকে।
স্লো কুকিং পদ্ধতি
কঠিন কাটের মাংসের জন্য এই পদ্ধতি উপযোগী। ধীরে রান্না করার ফলে মাংস খুব নরম হয়ে যায় এবং স্বাদ গভীর হয়।
মাখন ও রসুন
ভাজার শেষ দিকে মাখন ও রসুন যোগ করে মাংসের উপর দিন।
পরিবেশন
রান্না করা সবজি (ব্রকলি, ক্যাপসিকাম) ও সসের সাথে পরিবেশন করুন।
“বাংলাদেশি মাংসের রান্নার ইতিহাস জানতে পড়ুন”
👉 https://runnarhut.com
স্টেকের ধরন (রান্নার মাত্রা):
Rare: ভেতরটা লাল, নরম এবং সামান্য কাঁচা থাকে।
Medium Rare: ভেতরটা গোলাপি ও রসালো থাকে।
Medium: ভেতরটা হালকা গোলাপি।
Well Done: সম্পূর্ণ রান্না হয়ে যায়, ভেতরটা বাদামী ও শক্ত হয়।
স্টেক ডোননেস লেভেল
- রেয়ার: ভেতরে লাল ও খুব রসালো
- মিডিয়াম রেয়ার: হালকা গোলাপি, সবচেয়ে জনপ্রিয়
- মিডিয়াম: মাঝারি নরম
- মিডিয়াম ওয়েল: প্রায় সম্পূর্ণ রান্না
- ওয়েল ডান: পুরোপুরি রান্না করা
বিফ স্টেকের সাথে কী পরিবেশন করবেন?
- ম্যাশড পটেটো
- গ্রিলড সবজি
- sauté করা মাশরুম (sauté শব্দটি ফরাসি এর অর্থ—অল্প তেলে, মাঝারি বা উচ্চ তাপে দ্রুত ভাজা।)
- ফ্রেঞ্চ ফ্রাই
- গার্লিক বাটার বা পেপার সস
সঠিক সাইড ডিশ স্টেকের স্বাদ আরও বাড়িয়ে তোলে।
গরুর মাংসের স্টেক খাওয়ার স্বাস্থ্য দিক
যারা নিয়মিত ভারী কাজ করেন বা শরীরচর্চা করেন, তাদের জন্য গরুর মাংসের স্টেক উপকারী। তবে উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের পরিমিত খাওয়া উচিত। চর্বি কম অংশ বেছে নিলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে।
বাংলাদেশে বিফ স্টেকের জনপ্রিয়তা
আগে গরুর মাংসের স্টেক মূলত অভিজাত রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ঘরে ঘরেই এটি রান্না হচ্ছে। অনলাইন রেসিপি, ইউটিউব ও ফুড ব্লগের কারণে মানুষ সহজেই স্টেক বানাতে শিখছে। দেশীয় স্বাদের সাথে মিলিয়ে অনেকেই নিজস্ব স্টাইলে এটি তৈরি করছেন। অতিথিদের নতুন স্বাদের খাবার খাওয়াতে বাসায় রান্না করতে পারেন গরুর মাংসের স্টেক|
ঘরোয়া টিপস নিখুঁত বিফ স্টেকের জন্য
১. সঠিক মাংস নির্বাচন: স্টেকের জন্য সাধারণত রিব-আই (Rib-eye), সিরলোইন (Sirloin) বা টেন্ডারলইন (Tenderloin) সবচেয়ে ভালো। খেয়াল রাখবেন মাংসে যেন হালকা চর্বির স্তর বা মার্বেলিং থাকে, যা স্টেককে জুসি বা রসালো করে।
২. রুম টেম্পারেচার: ফ্রিজ থেকে বের করেই সরাসরি রান্না করবেন না। মাংস রান্নার অন্তত ৩০ মিনিট আগে বের করে সাধারণ তাপমাত্রায় (Room Temperature) নিয়ে আসুন। এতে মাংসের ভেতর-বাইরে সমানভাবে সেদ্ধ হয়।
৩. ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া: রান্নার আগে কিচেন টিস্যু দিয়ে মাংসের ওপরের পানি ভালো করে মুছে নিন। মাংসের উপরিভাগ যত শুষ্ক হবে, প্যানে দেওয়ার পর তা তত সুন্দর বাদামী (Sear) হবে।
৫. কাস্ট আয়রন প্যান ব্যবহার: ভালো মানের স্টেকের জন্য কাস্ট আয়রন প্যান সবচেয়ে কার্যকর কারণ এটি তাপ ধরে রাখতে পারে। প্যান খুব গরম হলে তবেই মাংস দিন।
৬. বাটার বাস্টিং: রান্নার শেষ ১-২ মিনিটে প্যানে মাখন (Butter), কয়েক কোয়া রসুন এবং রোজমেরি বা থাইম দিন। গলানো মাখন চামচ দিয়ে বারবার মাংসের ওপর ঢালুন (Basting), এতে চমৎকার ফ্লেভার তৈরি হবে।
৭. বিশ্রাম বা রেস্টিং (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ): চুলা থেকে নামানোর পর স্টেক সাথে সাথে কাটবেন না। অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এতে মাংসের ভেতরের রস সবদিকে ছড়িয়ে যায় এবং স্টেক নরম থাকে।
৮. মাংসের তাপমাত্রা: মাংস সেদ্ধ করার জন্য মিডিয়াম রেয়ারের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১৪৫°F (৬৩°C) হওয়া প্রয়োজন।
- অতিরিক্ত মশলা ব্যবহার করবেন না
- উচ্চ তাপে দ্রুত রান্না করুন
- রান্নার পর ৫ মিনিট রেস্ট দিন
- ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে পরিবেশন করুন
“মসলার স্বাস্থ্য উপকারিতা জানতে দেখুন”
👉 https://runnarhut.com/category/spices
উপসংহার
বিফ স্টেক শুধু একটি খাবার নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা। সঠিক মাংস নির্বাচন, সঠিক রান্না পদ্ধতি এবং সামান্য যত্ন নিলেই ঘরেই রেস্টুরেন্ট মানের স্টেক তৈরি করা সম্ভব। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই খাবারটি পরিমিত পরিমাণে খেলে শরীর ও মন—দুটোই তৃপ্ত হয়। আপনি যদি নতুন কিছু রান্না করতে চান বা অতিথিদের চমকে দিতে চান, তবে গরুর মাংসের স্টেক হতে পারে সেরা পছন্দ।
ঘরে বসে রেস্টুরেন্ট স্টাইল বিফ স্টেকের স্বাদ বানাতে চান?
তাহলে এমন আরও মজাদার ও সহজ রেসিপির জন্য চোখ রাখুন 👉 Runnar Hut

Leave a Reply Cancel reply